জেলা পর্যায়ে ২০২৪ সালে ৫টি ক্যাটাগরিতে বিজয়ী ৫ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতা
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী (সদর)
আমি নূর ফাতিমা,পিতা- হাসান কবির, মাতা- মোসা: পারভীন আক্তার, গ্রাম-বেলেপুকুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আমি জন্ম একজন গরীব চা-দোকানদারের ঘরে। ছোটতে গরীব বাবার কিনে দেওয়া সাধারণ পোশাক নিজেই বিভিন্ন ডিজাইনের করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতাম। পরিবার থেকে কম বয়সেই পরনারীতে আসক্ত দায়িত্বহীন এক পুরুষের সাথে বিয়ে দেন, সে বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই মেয়ে শিশুসহ আমাকে নির্যাতন করে এক পর্যায় ডিভোর্স দেন। মেয়ের খরচ যোগাতে উপায়ন্ত না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেতির ব্যাগ, পুঁথির ব্যাগ, পুঁথির বিভিন্ন জিনিস বানিয়ে সেল দিতে শুরু করি এবং মেয়েকে নিয়ে বাঁচার লড়ায় শুরু করি। ক্লিনিকে ও এনজিও সহ বিভিন্ন জবের চেষ্টা করি। কিন্তু জব করে মেয়েকে দেখাশুনা করা ছিল কঠিন। বিধায় জব ছেড়ে এক আন্টির পরামর্শে হ্যান্ড পেইন্ট ও কুশি কাটার, পুঁথি এবং হাতের কাজের পোশাক বানিয়ে বিক্রয় করতে লাগি এবং দ্রুতই এটাকে আয়ত্ত করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নামকরা উদ্যোক্তাদের মাঝে একজন হয়ে যায়। ফেসবুক ও এরওর মাধ্যমে সুনাম ছড়িয়ে পড়লে অনেক অর্ডার আসতে শুরু করে। বর্তমানে মেয়ের নামে মাটি এবং টাকা সঞ্চয় করছি। মেয়েকে লেখাপড়ার পাশাপাশি কারাতে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, সে জুডো ও কারাতে খেলায় ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল পর্যায় স্বর্ণ, রুপো এবং সিলভার মোট ১০ টি সম্মাননা অর্জন করেছেন। আমি এখন সফল উদ্যোক্তা , অবহেলিত নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করি, এর পাশাপাশি একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছি।
শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন কারী নারী (নাচোল)
আমি লাভলী ইয়াসমিন ১৯৮২ সালের ১৫ ই মে পিতা আব্দুল মান্নান ও মাতা জামিলা বেগম এর এক নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে জম্মগ্রহন করি। বাবা নিম্নমান সহকারী হিসাবে সরকারী অফিসে চাকুরী করলেও ১২ ভাই বোনের পরিবারে সববসই লেগে থাকত অভব অনোটন। আমি ছিলাম বাবা মায়ের ১০ম সন্তান।টানাজীনিরসংসারে অনেক অভাবকে মেনে নিয়েইআমি লেখাপড়া করেছি। আমার মা বাবার অর্থে সংসার চলত না বলে গরু দুধ মুরগী ওডিম, শাকসজবী বাড়ির পাশে উৎপাদন করে সে গুলো আমাদের মাধ্যমেই বিক্রি করত আমি মানুষের বাষায় গিয়ে দুধ ডিম এগুলো দিয়ে আসতাম। তা থেকে যে অর্থ আসত সেটা দিয়ে খাতা কলম কিনতাম ১দিক ব্যবহত কাগজের অন্য পৃষ্টায় নিজের পড়ার লিখাগুলো বাডিতে লিখতাম। শতকষ্টর মাঝেও লেখা পড়া ছেড়ে দেয়নি বরং সংসারের অভাব অনটন নিজেদেরকে আরো বেশি সাহস যুগিযেছে সামনে এগিয়ে যাবার, মানুষ হবার।
আমি প্রথম থেকেই লেখাপড়ায় বেশ ভালো ছিলাম । ১৯৯২ সালে পিত্রা.সিতে নাচোল মেধা তালিকায় ৩য় স্হান অধিকার করি ১৯৯৭ সালে এস,এস,সি তে ১ম বিভাগ সহ স্টার র্মাকস নিয়ে পাশ করি । অভাব অনটনের কারনে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলেওপড়ালেখা বন্ধ হতে দেননি। ৫ম শ্রেনী পাশের পর থেকেই আমি নিচুক্লাসের ছেলে মেয়েদের প্রাভেট পড়ানো শুরু করেছিলাম। একসময় বাবা অসুস্হ হলে পরিবারে অর্থের অভাবে নেমে আসে এক কঠিন মানবতের জীবন । অনেক দিন গেছে যে কোন রকমে ১বার খেতে দিতে পেরেছেন অন্য ২বেলা না খেয়ে থেকেছি।
মা ভিক্ষুকের ভিক্ষাকার চাল পর্যন্ত বার্কিতে নিয়ে গাছের কলা পেপে খাইয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এভাবেই অভাবকে অলিংগন করে লেখাপড়া চালিয়ে যায ২০০১সালে উচ্চ মাধ্যিকে ২য় বিভাগস সহ উত্তীন হয় । এবং ১৮বছর পূর্ণ হলেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে আবেদনকরি এবং মেধাং তালিকায় ৫ম হয়ে চাকুরী পাই । ২০০১ থেকে ২০০৬সাল পযন্ত সম্পৃর্ণ রুপে বাবাকে আথিক সাহার্য্য সহ ছোট ভাই বোনদের লেখা পড়াও আমার প্রাইভোট লেখাপড়া চালিয়ে যায ।২০০৬সালে বিয়ে হয় । আমি ১ সন্তানের জননী স্বামী সংসারে লেখাপড়া ভাইবোন ও চাকুরী সবকুছুই সকলের সহযোগিতায় সুন্দরভাবে চালাচ্ছি। আমি ২০২২ সালে উপজেলা পযার্য়ে শ্রেষ্ট প্রধান শিক্ষক২০২৩ সালে জেলা পযার্য়ে শ্র্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নিবাচিত হয় । আবারো ২০২৪ সালে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষাক নিচার্বাচিত হয়।
আমি আমার বিদ্যালয়ের ছা্ত্রী ছাত্র শিক্ষক অভিভাবক সকলের সহযোগিতায় সকলের উন্নয়নে বিভিন্ন কমূসূচী গ্রহনকরে বিদ্যালয় টিকে একটি আর্দশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপনিত করতে সক্ষম হয়েছি।বতমানে আমি বিদ্যালয়ের উন্নয়ণে প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছি ।
সফল জননী নারী (ভোলাহাট)
আমি মোসা: কুলসুম আরা, পিতা: মো: এস্তাব আলী বিশ্বাস, মাতা: মোসা: হামিদা বানু, গ্রাম: নামোমুশরীভূজা, পোস্ট: মুশরীভূজা, উপজেলা: ভোলাহাট, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আমি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি (১৯৭৪ সাল) বাবা মা আমার বিয়ে দিয়ে দেন। তখন আমার শ্বশুর বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না। আমার স্বামী তখন বি.এ পড়ে। শ্বশুর বাড়ির জনসংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন প্রায় (কারন শ্বশুরের তিনটি বিয়ে) কষ্ট করে দিন পার করতে হয়েছে। এমতাবস্থায় আমার স্বামীর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকুরি হয়। সেই সময়ে আমার সংসারে চারটি ছেলে মেয়ে। যৌথ পরিবারে আমার স্বামী একমাত্র উপার্জনের উৎস। আমার স্বামী চাকুরি পেলেন ঠিকই কিন্তু যৌথ পরিবার চালাতে গিয়ে আমার ছেলে মেয়েদের জন্য তার চাকুরির উপার্জিত অর্থ খুব বেশি কাজে আসেনি। এমতাবস্থায় চারটি ছেলে মেয়েদের প্রতিবছরের লেখাপড়া ও ভরন পোষনের খরচ চালাতে গিয়ে অনেক সময় অনাহারে অর্ধহারে থাকতে হয়। অনেক সময় একটি দুটি কাপড়ে কয়েক বছর পার করেত হয়। এছাড়াও সংসার চালানোর জন্য জমাকৃত খাদ্য শস্য বিক্রি করে কয়েকবার ফরম ফিলাপ করিয়েছি। সেই সময় ধান, চাল, আটা, ছাতু কুটানোর মেশিন থাকলেও পয়সার অভাবে ছেলে মেয়েদের মানুষ করার স্বার্থে ভোর রাত থেকে উঠে ঢেকিতে ধান ভেংগে চাল এবং সেই চাল যাঁতাতে পিষে আটা তৈরী করে খাবার ব্যবস্থা করেছি। সেই সাথে অভাবকে মোকাবিলা করার জন্য গরু ছাগল পালন করেছি।
দুঃখের অনেক কথা রয়েছে যেগুলো আমার বর্তমান সম্মান, পরিবেশ ও সময়ের সাথে নিজেকে ছোট করতে চাইনা। আমার চার ছেলে মেয়ের মধ্যে (১) বড়মেয়ে বি.এ পাশ করে কাশিয়াবোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। (২) বড় ছেলে এম.এ পাশ করে গোহালবাড়ী ফাজিল মাদ্রাসার ইংরেজি প্রভাষক। (৩) ছোট ছেলে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স থেকে বি.এস.সি পাশ করে এখন মালেশিয়া এয়ারলাইন্স গ্রুপে (বাংলাদেশে) কর্মরত । (৪) ছোট মেয়ে বি.এ পাশ করে মুশরীভূজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। বর্তমানে আল্লাহর রহমতে আমার পরিবার নিয়ে আমি ভালো আছি।
নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী (শিবগঞ্জ)
আমি মোসাঃ তাসলিমা খাতুন,পিতাঃ মৃত- সৈবুর রহমান মাতাঃ মোসাঃ শামসুন নাহার, গ্রামঃ নতুন পাড়া, পোঃ শিবগঞ্জ শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আমি আমার জন্মদাতা-দাত্রীর এক অনাকাংখিত সন্তান। এখনও জানিনা এ পৃথিবীতে আসার ক্ষেত্রে আমার অপরাধ কি ছিল? ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আমার বাবা-মা আমাকে বিয়ে দেয়। বিয়ের এক বছর পরে তাঁর প্রথম সন্তান জন্ম গ্রহন করে। এরপর তাঁর স্বামী বেশিভাগ সময় নেশা সেবর করে গভীর রাত পর্যন্ত বাহিরে থাকত। বাসায় এসে তাঁর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতো। এক পর্যায়ে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ডিভোর্স দিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাসায় চলে আসি। ডিভোর্সের পর আমাকে আর্থিক ভাবে অনেক কষ্টের জীবন যাপন করতে হয়। ডিভোর্স দেবার কারণে বাবা যতদিন বেঁচে ছিল সাহায্য করেছে । কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর ভাই-বোন ও আত্মীয় স্বজন সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা শুধু বাদই করেনি , বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় সকল কিছুই কেড়ে নেন। নিজে অনেক কষ্ট করে প্রাইভেট পড়িয়ে হাতের কাজ করে ছেলে মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়েছি। এ কারনে পরিবারের সাহায্যহীন সিঙ্গেল মাদার এর এ সমাজে কত যন্ত্রনা তা মুখবুজে সহ্য করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টাকে দমতে দেয়নি। নিজকে এ পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখতে ২০২০ সালে ক্ষুদ্র ব্যবস্থার মাধ্যমে সকল বাধা বিপত্তিকে জয় করে আজকে আমি একজন সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী (সদর)
আমি মুনিকা সরেন,পিতা- মহুল সরেন, মাতা- জবা হাসদা, গ্রাম-নাধাই কৃষ্ণপুর, ডাকাঘর- গোবরাতলা, সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। যুগ যুগ ধরে অবহেলিত ও মৌলিক চাহিদা গুলো হতে বঞ্চিত আদিবাসিদের করুণ দশা দেখে আমি মনিকা সরেন সর্বদা ভাবতে থাকি কিভাবে তাদের এ অবস্থা থেকে মুক্ত করা যায়। ডাসকো ফাউন্ডেশনে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম, বিভিন্ন সভা, প্রশিক্ষণ, সংলাপে অংশগ্রহনের ফলে আমার জড়তা দূর হয় ও সরকারী প্রতিষ্ঠানের সেবাসমুহ সম্পর্কে জানতে পারি। আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবন মানন্নোয়নের জন্য প্রথমে ৩জন ও পরে ১৩জন পুরুষকে গরু পালণ প্রশিক্ষণ নিতে সহায়তা করি। যারা প্রশিক্ষণ শেষে একটি করে বকনা গরুও পায়। এরপরে ৩৫ জন নারী-পুরুষকে গবাদী ও ১৫ জন নারী-পুরুষকে মুরগীর পালন প্রশিক্ষণ ও ঘর পেতে সহযোগিতা করেন। তারপরও ২৫ জনকে হাঁস এবং ৩০ জনকে মুরগী; ৪০ জনকে ভেড়া পালন প্রশিক্ষণ পেতে সহযোগিতা করি। এভাবে অনেক আদিবাসী অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বি হয়েছেন। এছাড়াও স্কুল-কলেজ দূরে হওয়ায় ঝরে পড়া গ্রামের ছাত্র-ছাত্রীদের পিকেএসএফ'র মাধ্যম বাইসাইকেল পাওয়ার ব্যবস্থা করি। এছাড়াও উপজেলা থেকে বিশেষ এলাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উন্নয়ন সহায়তা থেকে ২০২৩-২০২৪ সালে ২৫ জন ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষাবৃত্তি এবং ৪ জন ছাত্রীকে বাইসাইকেল পেতে সহায়তা করি। এখন সবাই বলে মনিকা সরেন আদিবাসী সমাজের তথা নারী সমাজের অনুপ্রেরণার প্রতিচ্ছবি। মুলধারায় প্রান্তিক অবহেলিত আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ গুলোকে যুক্ত করতে এমন মনিকা তৈরী হোক ঘরে ঘরে।
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, এটুআই, বিসিসি, ডিওআইসিটি ও বেসিস